গ্যাস সংকট কাটবে কবে?

ছবির উৎস, NurPhoto via Getty Images
- Author, সজল দাস
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
- Published
- পড়ার সময়: ৫ মিনিট
"বেশিরভাগ পাম্পেই গ্যাসের প্রেশার নাই। যেটায় একটু আছে সেখানে লম্বা লাইন, ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকা লাগে। অনেক এলাকার পাম্পে তো গ্যাস নাই বলে বন্ধই করে রাখছে।"
বিবিসি বাংলাকে এভাবেই বলছিলেন ঢাকার নতুন বাজার এলাকার বাসিন্দা, প্রাইভেটকার চালক মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন। সপ্তাহজুড়ে গ্যাস স্টেশনগুলোতে চরম ভোগান্তির কারণে আপাতত গাড়ি বের করাই বন্ধ রেখেছেন বলে জানান তিনি।
গ্যাস সংকটে চরম দুর্ভোগ বাসাবাড়িতেও। ঢাকার মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা ফজলে রাব্বি সৌরভ জানান, গ্যাস না থাকায় সপ্তাহজুড়ে রেস্টুরেন্টের খাবারই তার ভরসা।
"চারজন ব্যাচেলর বাসায় থাকি, রান্না করার জন্য লোক রাখা আছে। সারাদিন গ্যাস থাকে না, রাত ১২টার পর একটু আসে, তাও প্রেশার থাকে না। ওই সময় আবার রান্নার লোক আসতে পারবে না। চরম ভোগান্তিতে আছি, রেস্টুরেন্টই ভরসা," বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।
দুর্ভোগ চরমে ঢাকার মিরপুর ৬০ ফিট সড়ক সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা সুকন্যা আমীরের। ধারাবাহিক গ্যাস সংকটের কারণে রান্নার জন্য বৈদ্যুতিক চুলা ব্যবহার করতে বাধ্য হচ্ছেন তিনি।
"এমনিতেই এই এলাকায় গ্যাসের সমস্যা আছে। কিন্তু গত কয়েকদিন ধরে গ্যাস আসে না বললেই চলে। ইনডাকশনে রান্না করে বাড়তি বিদ্যুৎ বিল দিচ্ছি আবার গ্যাস সংযোগ থাকায় সেখানেও বিল দিতে হচ্ছে," বলেন মিজ আমীর।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কেবল ঢাকায়ই নয়, আশপাশের জেলা নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর ও নরসিংদীর অনেক এলাকায় গ্যাস সংকট চরম আকার ধারণ করেছে।
নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ না থাকায় সাভার ও গাজীপুরের শিল্প কারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে বলেও খবর পাওয়া গেছে।
দেশে মোট চাহিদার তুলনায় গ্যাসের সরবরাহ কম থাকায় এ নিয়ে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি নতুন নয়। কিন্তু গত সপ্তাহ থেকে সরবরাহ ঘাটতির কারণে অনেক এলাকার পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে উঠেছে।
সাম্প্রতিক সংকটের কারণ হিসেবে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা ফ্লোটিং স্টোরেজ অ্যান্ড রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিটে কারিগরি ত্রুটির কথা বলছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ।
গত বুধবারের সংবাদ সম্মেলনে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের পক্ষ থেকে দুই-তিনদিনের মধ্যে সমস্যা সমাধানের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত গ্যাস সংকট আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে।
এদিকে, এই সংকটের মধ্যেই সিএনজি বিক্রিতে কমিশন বাড়ানোর দাবিতে ধর্মঘটে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভার্সন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন।
শনিবার পেট্রোবাংলার সঙ্গে এ নিয়ে বৈঠক হলেও কোনো সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি বলে বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা।

সংকট কাটবে কবে?
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম হওয়ায় বাংলাদেশে গ্যাস সংকটের বিষয়টি নিয়মিত।
জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশে তিন হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ সক্ষমতা সব মিলিয়ে দুই হাজার ৭০০ থেকে দুই হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট।
চাহিদার বাকি অংশের জোগান নিশ্চিত করা হয় বিদেশ থেকে আমদানির মাধ্যমে। এমন পরিস্থিতিতে এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) টার্মিনালে ত্রুটি দেখা দেওয়ার কারণে মাঝেমধ্যেই সংকট চরম আকার ধারণ করে।
জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের মুখপাত্র মনির হোসেন চৌধুরী জানিয়েছেন, এবারও ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে বা এফএসআরইউ এ যান্ত্রিক ত্রুটির কারণেই গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটেছে।
বাংলাদেশে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজি জন্য কক্সবাজারের মহেশখালীতে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউ রয়েছে।
এক্সিলারেট এনার্জি এবং সামিট গ্রুপ পরিচালিত এই টার্মিনালগুলোর মাধ্যমেই বিদেশ থেকে আনা এলএনজি রিগ্যাসিফিকেশন বা রূপান্তর করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়।
যার একটিতে ত্রুটি হওয়ায় গ্যাস সরবরাহ নিয়ে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। শুরুতে এই সংকটকে সাময়িক হিসেবে উল্লেখ করা হলেও ত্রুটি চিহ্নিত করতে সময় বেশি লাগার কারণেই প্রেক্ষাপট জটিল হয়েছে।
এই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে ঠিক কত সময় লাগতে পারে সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য দেননি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
বিবিসি বাংলাকে তিনি জানান, "সমস্যাটা এফএসআরইউতে। আমাদের দেশীয় বিশেষজ্ঞরা শুরুতে সমস্যাটা চিহ্নিত করতে পারছিল না। পরবর্তীতে যুক্তরাজ্য ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে বিশেষজ্ঞ এসেছেন, তারা সমস্যাটা চিহ্নিত করেছেন। এখন তারা এটি সমাধান করার জন্য কাজ করছেন।"
"এটা একটা টেকনিক্যাল প্রবলেম, এক্ষেত্রে টাইমফ্রেম ধরে কথা বলাটা কঠিন। আমাদের পেট্রোবাংলা এবং মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি বিভাগও তাদের সঙ্গে নিবিড়ভাবে রয়েছে, কাজ করছে। আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি যে এটাকে যত দ্রুত সম্ভব ফাংশনাল করা যায়," বিবিসি বাংলাকে বলেন প্রতিমন্ত্রী।

ছবির উৎস, EXCELERATEENERGY
স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না কেন?
অভ্যন্তরীণভাবে উৎপাদনের সক্ষমতা থাকার পরও চাহিদা মেটাতে বিদেশ থেকে বেশ বড় মাত্রায় গ্যাস আমদানি করে বাংলাদেশ, যা মোট চাহিদার প্রায় এক তৃতীয়াংশ।
অথচ দেশে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে তেমন অগ্রগতি নেই। ফলে জ্বালানি নিরাপত্তা সবসময়ই হুমকির মুখে থাকছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
তারা বলছেন, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্ব না দেওয়ায় আমদানিকৃত এলএনজির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। ফলে আমদানি অবকাঠামোর কোনো একটি অংশে সমস্যা দেখা দিলে তার প্রভাব পড়ছে জাতীয় গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায়।
উৎপাদন ও মজুদের ক্ষেত্রে নিজস্ব সক্ষমতা অর্জন ছাড়া এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয় বলেই মনে করেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক, জ্বালানি ও টেকসই উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ড. ইজাজ হোসেন।
"আমরা সবসময়ই ওয়ান থার্ড শর্টেজ-এর মধ্যে আছি। এরপর আবার যদি একটা এফএসআরইউ বিকল হয়, তাহলে তো আমাদের আরো ক্রাইসিস," বলেন তিনি।
এছাড়া দুটি ভাসমান টার্মিনালের পাশাপাশি ল্যান্ড বেইজড এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণে গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের।
"আরও একটা এফএসআরইউ আমাদের একদম অপরিহার্য হয়ে গেছে। তাও আমাদের চাহিদা পূরণ হবে বলে মনে হয় না, অনেক আগেই ওইটা করে ফেলা উচিত ছিল," বিবিসি বাংলাকে বলেন মি. হোসেন।
এক্ষেত্রে দেশে সরকার পরিবর্তনের সাথে নীতির পরিবর্তন হওয়ার বিষয়টিকেও দুষছেন এই বিশেষজ্ঞ।

ছবির উৎস, NurPhoto via Getty Images
তিনি বলছেন, "একটি এফএসআরইউ পাইপ লাইনে ছিল, কিন্তু রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেটি বাতিল হয়েছে। এক সরকার আসে, সিদ্ধান্ত নেয়, তারা চলে গেলে আবার নতুন সরকারের পরিকল্পনা আসে, এভাবে তো হবে না।"
এছাড়া জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতে প্রয়োজনে বিকল্প উৎসের কথাও ভাবতে বলছেন মি. হোসেন।
"আমরা সব সময় গ্যাস গ্যাস করে যাচ্ছি, কিন্তু অনেক দেশ আছে যেখানে গ্যাস নাই, তারা কীভাবে ম্যানেজ করছে? প্রয়োজনে আমাদের এনার্জি সাপ্লাইটা অন্যভাবে চিন্তা করা উচিত," বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে- দেশে গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত।
এছাড়া জ্বালানি মজুত ও সরবরাহ সক্ষমতা বাড়াতে ল্যান্ড বেইজড এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী।
তিনি বলছেন, "অতিরিক্ত আরও দুই একটা এফএসআরইউ স্থাপনের কাজ চলছে, পাশাপাশি মাতারবাড়িতে ল্যান্ড বেইজড এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের প্রাথমিক কাজও আমরা শুরু করেছি।"
এছাড়া, দেশের স্থলভাগ ও সমুদ্র এলাকায় গ্যাস অনুসন্ধানে অফশোর ও অনশোর মডেল পিএসসির আওতায় গ্যাস উৎপাদনের জন্য দরপত্র আহ্বান এবং দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার কাজও চলছে বলে জানান তিনি।








