আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
বাংলাদেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে- বিএনপিতে কী আলোচনা হচ্ছে?
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির পদ থেকে মো. সাহাবুদ্দিনের বিদায়ের পর পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন- এই আলোচনা জোরদার হয়ে উঠেছে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন, বিশেষ করে সরকারি দল বিএনপির মধ্যে। পাশাপাশি কী কারণে হুট করে মি. সাহাবুদ্দিনকে পদত্যাগ করতে হলো, তা নিয়েও কৌতূহল আছে অনেকের মধ্যে।
সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের পর ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করবে জাতীয় সংসদ। সে অনুযায়ী আগামী ২৪শে অক্টোবরের মধ্যেই এর নিষ্পত্তি হবে বলে আজ সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঢাকায় সাংবাদিকদের বলেছেন, বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটি এ বিষয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেবে এবং দলের সিদ্ধান্তই হবে চূড়ান্ত।
একই কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভীও।
এর আগে শুক্রবার পদত্যাগ করেছেন বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। ২০২৩ সালে রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেওয়া তিন বছর তিন মাস পর তিনি পদত্যাগ করেন। তার পদত্যাগ সম্পর্কে কয়েকদিন আগে থেকেই নানা ধরনের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছিল।
তার পদত্যাগের পর সংবিধান অনুযায়ী ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিয়েছেন জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলছেন, নতুন রাষ্ট্রপতি কে হবেন- সেটি ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতৃত্বই ঠিক করবেন, তবে বিএনপি যেন দেশের অভিভাবক হওয়ার মতো কাউকেই এই পদের জন্য বেছে নেয় সেটিই সবার চাওয়া থাকবে।
বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলছেন, অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের মধ্য থেকে কাউকে রাষ্ট্রপতির জন্য বেছে নেওয়াটাই হবে শ্রেয়।
আলোচনা ও কৌতূহল কাদের নিয়ে
রাষ্ট্রপতি পদে কে আসবে- এ নিয়ে বিএনপির মধ্যে আলোচনা নতুন কিছু নয়। বরং গত ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে দলটি জয়ী হয়ে সরকার গঠনের সময় থেকেই দলের ভেতরে এ নিয়ে কৌতূহল ক্রমশ বাড়ছিল।
"এর কারণ হলো আওয়ামী লীগের সময়কার রাষ্ট্রপতিকে বিএনপি যে রাখবে না সেটা তো অনিবার্যই ছিল। প্রশ্ন ছিল যে কখন সেই উদ্যোগ নেওয়া হবে। এখন যেহেতু পদত্যাগ হয়ে গেছে তাই বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বই ঠিক করবেন যে কে রাষ্ট্রপতি হবেন," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন মহিউদ্দিন আহমদ।
তবে রাষ্ট্রপতির পদ থেকে মো. সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের মুহূর্ত থেকেই বিএনপির নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ও দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে নিয়ে।
পঞ্চম জাতীয় সংসদে স্পিকার থেকেই রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন আব্দুর রহমান বিশ্বাস এবং সে কারণেই অনেকেই মনে করেন শেষ পর্যন্ত সাত বারের সংসদ সদস্য হাফিজ উদ্দিন আহমদও হয়ে উঠতে পারেন রাষ্ট্রপতি পদের জন্য দলের শীর্ষ নেতৃত্বের চূড়ান্ত পছন্দ।
অন্যদিকে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এ মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পরেই দলের দ্বিতীয় ব্যক্তি।
দলের নেতাকর্মীরা অনেকে মনে করেন, মি. রহমানের লন্ডনে থাকার সময়কালে দীর্ঘ প্রায় দেড় দশক আওয়ামী লীগ বিরোধী আন্দোলন ও পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কঠিন পরিস্থিতি সামলেছেন মি. আলমগীর।
এ পদে যেতে তিনি আগ্রহী কি-না এমন এক প্রশ্নের জবাবে সাংবাদিকদের আজ মি. আলমগীর বলেছেন যে, "দেশের সংবিধান মেনে এ বিষয়ে দল যে সিদ্ধান্ত নেবে তাই চূড়ান্ত"।
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভীও আজ সাংবাদিকদের বলেছেন, নতুন রাষ্ট্রপতি কে হবেন সেটি দলের উচ্চপর্যায়েই সিদ্ধান্ত হবে।
তবে দলের মধ্যে অনেকের আবার এমন মতও আছে যে, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় মি. আলমগীর দলের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডেই সক্রিয় থাকুন।
এছাড়াও নেতাকর্মীদের অনেকের মধ্যে দলটির সিনিয়র নেতা আব্দুল মঈন খান, খন্দকার মোশাররফ হোসেন, নজরুল ইসলাম খান ও সেলিমা রহমানকে নিয়েও আলোচনা আছে।
তবে এর বাইরে সম্প্রতি জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিয়োগ পাওয়া আইরিন খানের নামও শোনা যাচ্ছে বিএনপির নেতাকর্মীদের আলোচনায়। তিনি প্রধানমন্ত্রীর আত্মীয় হওয়ায় তাকে নিয়ে গুঞ্জন বাড়ছে।
সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলছেন, রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করার অভিজ্ঞতা বিএনপির আছে এবং তিনি মনে করেন দলের শীর্ষ নেতৃত্ব নিশ্চয়ই সেসব অভিজ্ঞতাকে বিবেচনায় নেবে।
"রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব আব্দুর রহমান বিশ্বাস জেনারেল নাসিমের ক্যু ঠেকিয়ে দিয়ে গণতন্ত্রকে সমুন্নত রেখে প্রশংসিত হয়েছিলেন, অন্যদিকে ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের পর ওয়ান ইলেভেন এসেছিল। এসব চিন্তা করলে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরাই এ পদের জন্য শ্রেয় হবেন," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।
আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান আজ সাংবাদিকদের বলেছেন, আগামী ৬০ দিনের মধ্যেই সংসদ অধিবেশন বসবে এবং সেই অধিবেশনেই এর নিষ্পত্তি হবে যাবে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ বলছেন, "রাষ্ট্রপতির পদ অলংকারিক হলেও একটা ঐকমত্য থাকা উচিত যে, তিনি দল মতের ঊর্ধ্বে উঠে অভিভাবক হিসেবে ভূমিকা রাখবেন। তেমন একজন গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিকে পেলে ভালো হবে।"
হুট করে সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ কেন
বাংলাদেশে ২০২৪ সালের অগাস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ঘটনাবলীর কেন্দ্রে চলে এসেছিলেন তখনকার রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। তখন অনেকেই শাসনতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক সংকটের আশঙ্কা করেছিলেন।
মি. সাহাবুদ্দিন তার পদত্যাগপত্রে লিখেছেন, "সাংবিধানিক সংকট থেকে উত্তরণের অভিপ্রায়ে সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদের ক্ষমতাবলে আমি রাষ্ট্রপতি হিসেবে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের মতামত কামনা করি। অতঃপর বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের পরামর্শক্রমে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করি।"
ওদিকে পদত্যাগপত্র গ্রহণের পর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেছেন যে, রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত সরকারকে সমর্থন দিয়ে এসেছেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে নির্বাচিত হওয়া মি. সাহাবুদ্দিনকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির দিক থেকে দাবি ছিল। কিন্তু বিএনপি শীর্ষ নেতৃত্ব এমন কোনো ইঙ্গিত এতদিন দেয়নি যে মি. সাহাবুদ্দিনকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
মাত্র কয়েকদিন আগেই এটি প্রকাশ পায় যে তাকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে এবং এক পর্যায়ে চিকিৎসার জন্য ব্যাংককে যাওয়া স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদকে ঢাকায় আনা হয়। শুক্রবার তার কাছেই পদত্যাগপত্র পাঠান মো. সাহাবুদ্দিন।
এসব কিছু মিলিয়ে হুট করে রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ করানো নিয়ে নানা আলোচনা ডালপালা মেলছে রাজনৈতিক অঙ্গনে।
তবে বিএনপির কেউ কেউ বলছেন যে, দলের ভেতরেই প্রভাবশালী একটি অংশ রাষ্ট্রপতিকে সরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেন, যার মূল উদ্দেশ্য হলো – ক্ষমতাকে সুসংহত করা কিংবা সামনের জন্য কোনো ঝুঁকি না রাখা।
মূলত ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ডিসেম্বরে দেশে ফিরবেন- এমন ঘোষণা সংবাদ মাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর রাষ্ট্রপতি পরিবর্তনের উদ্যোগে গতি আসে বলে বিএনপির কয়েকজন নেতার সাথে কথা বলে ধারণা পাওয়া গেছে।