শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ডের মামলায় অভিযোগপত্রের শুনানিতে কী হলো, অভিযুক্ত কারা

    • Author, জান্নাতুল তানভী
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, ঢাকা
  • Published
  • পড়ার সময়: ৫ মিনিট

তেরো বছর আগে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে ঢাকার মতিঝিলে শাপলা চত্বরসহ কয়েকটি জায়গায় হত্যাকাণ্ডের মামলায় সোমবার অভিযোগপত্র আমলে নিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।

অভিযোগ আনা হয়েছে 'গণহত্যার', মানবতাবিরোধী অপরাধের। অভিযুক্ত করা হয়েছে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৪১ জনকে।

আসলে কি অভিযোগ আনা হয়েছে, সে ব্যাপারে সোমবার ট্রাইব্যুনালে শুনানির পর সংবাদ সম্মেলন করেছে প্রসিকিউশন।

২০১৩ সালের পাঁচ ও ছয়ই মে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশকে কেন্দ্র করে ঢাকার মতিঝিলে শাপলা চত্বর, নারায়ণগঞ্জ এবং চট্টগ্রামে ৬১ জনকে হত্যার অভিযোগে মামলাটি করেন সংগঠনটির অন্যতম নেতা আজিজুল হক ইসলামাবাদী।

সেই মামলায় সোমবার ট্রাইব্যুনাল অভিযোগপত্র আমলে নিয়ে পলাতক অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির নির্দেশ দিয়েছে।

একইসঙ্গে, আটজনকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে।

চিফ প্রসিকিউটর মো.আমিনুল ইসলাম বলেছেন, "এই মামলায় কনস্টেবল বা পুলিশের সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়নি। যে ৪১ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে, তারা কোনোভাবেই তাদের দায় এড়াতে পারবে না।"

সকাল থেকে ট্রাইব্যুনালে হাজির ছিলেন হেফাজতে ইসলামের বেশ কয়েকজন নেতা।

শুনানিতে কী হয়েছে?

সোমবার বেলা পৌনে বারোটায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে হামলা ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গণহত্যার অভিযোগপত্র আমলে নেওয়ার শুনানি শুরু হয়।

ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মি. ইসলাম শুনানিতে বলেন, "পাঁচই মে পুলিশ কন্ট্রোল রুমে একটি জরুরি সভা করা হয়। তৎকালীন আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকারের সহযোগিতায় অতিরিক্ত আইজিপি একেএম শহীদুল হক, বিজিবির তৎকালীন ডিজি জেনারেল আজিজ আহমেদ এবং র‍্যাবের কর্মকর্তারা ওই বৈঠকে মিলিত হন।

"সুপরিকল্পিতভাবে ইসলামিক সংগঠন বা গোষ্ঠী হেফাজতে ইসলামকে নিশ্চিহ্ন বা নির্মূল করে দেওয়ার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পাঁচই মে মধ্যরাতে শাপলা চত্বরে হামলা চালায়" বলে শুনানিতে উল্লেখ করেন চিফ প্রসিকিউটর।

শুনানিতে তিনি জানান, পরবর্তীতে 'গণহত্যার' চিহ্ন মোচনের চেষ্টাও করা হয়।

হেফাজতে ইসলামের নেতা-কর্মীদের দমাতে ওইদিন রাতে ও পরদিন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী "বৈদ্যুতিক বাতি বন্ধ করে সম্পূর্ণ ব্ল্যাকআউট করে" অভিযান পরিচালনা করে বলে শুনানিতে উল্লেখ করেন তিনি।

বিভিন্ন বাহিনী তাদের পরিচালিত অভিযানকে একেক নামে অভিহিত করে।

এর মধ্যে পুলিশ বাহিনী এটিকে "অপারেশন সিকিউরড শাপলা", র‍্যাব "অপারেশন ফ্ল্যাশ আউট" এবং বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড শাপলা চত্বরের অভিযানকে "অপারেশন ক্যাপচারড শাপলা" নামে অভিহিত করে।

এই মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীর, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, সাবেক তথ্য মন্ত্রী হাসানুল হক ইনুসহ ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে 'সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটির' অভিযোগ আনা হয়েছে।

শুনানি শেষে এক সংবাদ সম্মেলনে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম অভিযোগ করেছেন, "শাপলা চত্বরের ওই ঘটনার পর থেকে তৎকালীন সরকার এই মামলার ৬১ জনের হত্যাকাণ্ডের কোনো তদন্ত পরিচালনা করেনি।"

মি. ইসলাম বলেন, "এই যে জেনোসাইড বাংলাদেশের ইতিহাসে এরকম বর্বরোচিত হত্যা ও আক্রমণ আর হয়েছে কি না, আমার জানা নাই।

তিনি বলেন, "একটি ইসলামিক গোষ্ঠী অথবা একটি ইসলামিক গ্রুপকে ডেস্ট্রয় বা নির্মূল করে দেয়ার জন্য তৎকালীন সরকার কিছু ব্লগার একটিভিস্ট বা কিছু লেফটিস্ট যাদেরকে নাস্তিক বলে সম্বোধন করতে পারি, এই জাতীয় কিছু মানুষের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে তাদের ওপর এই আক্রমণ করে"।

সে কারণে গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন মি. ইসলাম।

তিনি জানান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার তদন্তের বাইরেও মানবাধিকার সংগঠন অধিকারের কাছ থেকে এই বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।

"শাপলা চত্বরে পাঁচই মে মধ্যরাতে ৩২ জনকে হত্যা এবং পরদিন সিদ্ধিরগঞ্জে আরো ২০ জনকে হত্যার ঘটনাটি জেনোসাইড" বলে উল্লেখ করেন চিফ প্রসিকিউটর।

তিনি বলেন, "এই ঘটনার পরে শেখ হাসিনা নিজ মুখে বলেছিলেন কোনো হতাহতের ঘটনা, হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেনি। তারা নিজেদের গায়ে রং মেখে ঘটনা সাজিয়েছে।"

শুনানিতে চিফ প্রসিকিউটর জানান, সাবেক তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু সেসময় দুইটি টেলিভিশনের সম্প্রচার বন্ধ করতে লিখিত আদেশ দিয়েছিলেন।

"ইসলামিক এবং দিগন্ত টিভি ঘটনাটি সম্প্রচার করায় এবং তাদের কাছে অনেক তথ্য থাকায় তাদের লাইসেন্স বাতিলে হাসানুল হক ইনু লিখিত আদেশ দিয়েছিলেন" বলেন মি. ইসলাম।

'মাইনর' বা শিশু আছে কিনা, জানতে চান বিচারক

অভিযোগপত্র আমলে নেয়ার শুনানিতে ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরী চিফ প্রসিকিউটরের কাছে , এই ঘটনায় শাপলা চত্বরে নিহতদের মধ্যে কোনো 'মাইনর' অর্থাৎ অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশু রয়েছে কিনা, সেটি জানতে চান।

সেসময় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শাপলা চত্বরে শিশুও নিহত হয়েছিল বলে উল্লেখ করেন ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান।

"মা-বাবা নেই এতিম এমন বাচ্চাদেরকে হেফাজতের সমাবেশে নিয়ে আসা হয়েছিল?" প্রশ্ন করে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম জানান, "আমরা ইনডিপেনডেন্টলি ইনভেস্টিগেশন করে যেটা পেয়েছি, সেটাই দিয়েছি। হাইপোথেটিক্যালি আমরা বলতে পারি না।"

"আমাদের ইনভেস্টিগেশনের বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নাই। আমরা তদন্তে তিনজনকে পেয়েছি। যাদের বয়স ১৫ বা ১৪ বছর বয়সী" বলেন চিফ প্রসিকিউটর।

অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে অভিযোগ

এই মামলায় আটজনকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে।

তারা হলেন, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, সাবেক মন্ত্রী দীপুমনি, সাবেক আইজিপি এ কে এম শহীদুল হক, এনটিএমসির সাবেক প্রধান জিয়াউল আহসান, সাংবাদিক মোজাম্মেল হক, ফারজানা রূপা, শাহরিয়ার কবির এবং পুলিশের সাবেক ডিআইজি মো. আব্দুল জলিল মণ্ডল।

যেসব সাংবাদিককে এই মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে, তাদের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ আনা হয়েছে সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিক ডেভিড বার্গম্যান চিফ প্রসিকিউটরকে এমন প্রশ্ন করেন।

এ প্রশ্নের জবাবে চিফ প্রসিকিউটর জানান, সাংবাদিক ফারজানা রূপা সমীকরণ নামে একটি অনুষ্ঠান করেছেন যাতে শাপলা চত্বরের "ফুটেজ নিয়েছে তারা, কিন্তু প্রকৃত ঘটনা লুকিয়ে সত্যকে বিকৃত করে" প্রচার করা হয়েছে।

তবে শাহরিয়ার কবিরের বিরুদ্ধে কী অভিযোগ সে প্রশ্নের কোন উত্তর দেননি তিনি।

মামলাটির প্রধান আসামি শেখ হাসিনা ও তার মন্ত্রিসভার বাকি কয়েকজন সদস্য, পুলিশ কর্মকর্তাদের অনেকেই পলাতক রয়েছে।

মহিউদ্দিন খান আলমগীর, র‍্যাবের তৎকালীন মহাপরিচালক মো. মোখলেছুর রহমান বেনজীর আহমেদ, বিজিবির সাবেক মহাপরিচালক ও সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদসহ ৩০ জনের বেশি অভিযুক্ত পলাতক রয়েছে।

তাদের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারির নির্দেশ দিয়েছে ট্রাইব্যুনাল।

এই ঘটনায় তৎকালীন ব্লগার ডা. ইমরান এইচ সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে উল্লেখ করে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, "তিনি শাহবাগে দাঁড়িয়ে এই হেফাজত ইসলাম সম্পর্কে নানান ধরনের অশ্রাব্য বক্তব্য ও কুৎসা রচনা করতেন। তার ইন্ধনে ও প্ররোচনায় পরবর্তীতে এই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে।"

সাবেক আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকারের নেতৃত্বে পুলিশ "নির্বিচারে লেথাল উইপেন ইউজ করে এই হত্যা করা হয়" বলেন তিনি।

সাবেক আইজিপি একেএম শহীদুল হকের কথা উল্লেখ করে জানান, মি. হকের নিজের বইতে হেফাজতকে কিভাবে দমন করা হয়েছে সেটি বলা হয়েছে।

বিজিবির তৎকালীন ডিজি ছিলেন জেনারেল আজিজ আহমেদের (তিনি পরে সেনাপ্রধান হয়েছিলেন) নির্দেশে বিজিবির সদস্যরা এই হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয় বলে জানান চিফ প্রসিকিউটর।

এই মামলায় ৪১ জন অভিযুক্তের মধ্যে রয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ, সাবেক অ্যাডিশনাল আইজি শেখ মুহাম্মদ মারুফ হাসান, সাবেক অ্যাডিশনাল আইজি মাহবুব হোসেন, পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি মো. মনিরুল ইসলাম, অ্যাডিশনাল আইজি মো. আনোয়ার হোসেন।

একইসঙ্গে, ক্ষমতাচ্যুতআওয়ামী লীগের সরকারের সময়ে আলোচিত পুলিশ কর্মকর্তা হারুন অর রশিদ, বিপ্লব কুমার সরকারকেও এই মামলায় আসামি করা হয়েছে বলে জানান চিফ প্রসিকিউটর।

এছাড়া, ডিআইজি মো. আশরাফুজ্জামান, এসএম মেহেদী হাসান, সৈয়দ নুরুল ইসলাম, পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এস এম শিবলী নোমান এবং পুলিশ পরিদর্শক বি এম ফরমান আলীকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।

আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের কয়েকজন নেতাকেও অভিযুক্ত করা হয়েছে।