সরকার হঠাৎ মন্ত্রীদের 'পুলিশ প্রটোকল' তুলে নিল কেন, কতদিন কার্যকর থাকবে?

ছবির উৎস, AFP via Getty Images
- Author, তারেকুজ্জামান শিমুল
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
- Published
- পড়ার সময়: ৫ মিনিট
বাংলাদেশের রাজধানীতে চলাচলের সময় মন্ত্রীরা এতদিন যে 'পুলিশ প্রটোকল' বা বিশেষ নিরাপত্তা সুবিধা পেয়ে আসছিলেন, বেশিরভাগের ক্ষেত্রে সম্প্রতি সেটি প্রত্যাহার করে নিয়েছে সরকার। ফলে গত সপ্তাহখানেক ধরে তাদেরকে পুলিশের বিশেষ প্রহরা ছাড়াই ঢাকার রাস্তায় চলাচল করতে হচ্ছে।
"এমনকি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেও তার নিরাপত্তা বহর থেকে পুলিশ সদস্যদের সংখ্যা কমিয়ে এনেছেন," বলছিলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচ্চ পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা।
মন্ত্রিসভার দুই ডজন পূর্ণমন্ত্রীর মধ্যে বর্তমানে কেবল ছয়জন জ্যেষ্ঠ সদস্য ঢাকার মধ্যে পুলিশের বিশেষ প্রটোকল পাচ্ছেন। বাকি ১৮ জন মন্ত্রী কেবল ঢাকার বাইরে যাওয়ার সময় নিরাপত্তা সুবিধাটি নিতে পারবেন।
সরকারের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, এর ফলে বাহিনীটির সদস্যরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় আগের চেয়ে বেশি সময় ও মনোযোগ দিতে সক্ষম হবেন।
সেইসঙ্গে, প্রটোকলের গাড়ি থানায় ফেরত যাওয়ায় তাদের যানবাহন সংকটও কমে আসবে বলে মনে করছেন তারা।
কিন্তু তারেক রহমানের সরকার হঠাৎ করে মন্ত্রীদের 'পুলিশ প্রটোকল' তুলে নিল কেন?
"এটা হঠাৎ করে নেওয়া কোনো সিদ্ধান্ত নয়। নির্বাচনের আগেই তারেক রহমান পরিকল্পনা করে রেখেছিলেন যে, ক্ষমতায় গেলে তিনি প্রশাসনে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমিয়ে জনগণের অর্থ যেন যথাযথভাবে কাজে লাগানো হয়, সেটি নিশ্চিত করবেন। ওই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই নতুন এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে," বিবিসি বাংলাকে বলেন প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টা।

ছবির উৎস, NurPhoto via Getty Images
এখন প্রটোকল পাচ্ছেন কারা?
গত ১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর পাঁচদিনের মাথায় ক্ষমতা গ্রহণ করে বিএনপি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত নতুন সরকারের মন্ত্রিসভায় ২৪ জন পূর্ণমন্ত্রী ছাড়াও জায়গা পান ২৩ জন প্রতিমন্ত্রী।
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
এর বাইরে, প্রধানমন্ত্রীর ১০ জন উপদেষ্টা রয়েছেন, যাদের মধ্যে পাঁচজনকে মন্ত্রীর এবং বাকি পাঁচজন প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদা দেওয়া হয়েছে।
বিএনপি সরকারে থাকা এই ৫৮ জন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির মধ্যে ২৪ জন মন্ত্রী এবং মন্ত্রী পদমর্যাদার কয়েকজন উপদেষ্টা গত পাঁচ মাস ধরে পুলিশ প্রটোকল পেয়ে আসছিলেন।
কিন্তু গত ২০শে জুলাই সরকারের নতুন সিদ্ধান্ত কার্যকর হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বাইরে মাত্র ছয়জন মন্ত্রী এখনও ঢাকার রাস্তায় বিশেষ নিরাপত্তা সুবিধা পাচ্ছেন।
তাদের মধ্যে রয়েছেন: স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ।
এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাদের মধ্যে কেবল পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বর্তমানে পুলিশ প্রটোকল পাচ্ছেন।
এর বাইরে, পদাধিকারী বলে জাতীয় সংসদের স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, বিরোধী দলীয় নেতা, বিরোধী দলীয় উপনেতা, চিফ হুইপ এবং বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ পুলিশ প্রটোকল পেয়ে থাকেন।

ছবির উৎস, Getty Images
প্রটোকল প্রত্যাহার হলো যাদের
মন্ত্রিসভার সদস্যদের মধ্যে এখন পর্যন্ত ১৮ জন মন্ত্রীর পুলিশ এসকর্ট প্রত্যাহার করা হয়েছে।
তাদের মধ্যে রয়েছেন: আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের, শিক্ষামন্ত্রী আ ন ম এহছানুল হক মিলন, স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম এবং বাণিজ্য ও শিল্পমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির।
তালিকায় আরও নাম রয়েছে: পরিবেশমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টু, সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী, ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু, শ্রম ও প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, ধর্মমন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ, মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী আহমেদ আজম খান, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা, কৃষি ও মৎস্যমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ এবং তথ্যপ্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনামের।
"সরকারি নির্দেশে গত ২০শে জুলাই থেকে তাদের পুলিশ প্রটোকল প্রত্যাহার করা হয়েছে। তবে সরকারি সফরে ঢাকার বাইরে গেলে তারা পুলিশ প্রটোকল পাবেন," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) প্রটেকশন বা সুরক্ষা বিভাগের উপকমিশনার মো. শাহরিয়ার আলম।

ছবির উৎস, NurPhoto via Getty Images
'অপ্রয়োজনীয় ব্যয় রোধ'
রাস্তাঘাটে চলাচলের সময় এতদিন মন্ত্রীদের প্রত্যেকের সঙ্গে পুলিশি প্রটোকলের একটি গাড়ি রাখা হতো।
এক্ষেত্রে একজন মন্ত্রীর প্রটোকল টিমে সাধারণত পাঁচজন পুলিশ সদস্য থাকেন, যাদের মধ্যে একজন উপপরিদর্শক (এসআই) এবং চারজন কনস্টেবল।
তাদের খাবার-দাবার, বেতন-ভাতা ছাড়াও পুলিশের পিকআপ ভ্যানের জ্বালানি ও যন্ত্রপাতির যাবতীয় খরচ দেওয়া হয় জনগণের করের অর্থ থেকে।
এছাড়া মন্ত্রীদের সবাইকে বাড়তি নিরাপত্তা দিতে গিয়ে পুলিশ সদস্যের একটি উল্লেখযোগ্যকে থানার বাইরে রাখতে হয়।
"এতে পুলিশের নিয়মিত কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটে, বিভিন্ন মামলার তদন্তে ধীরগতি দেখা দেয়," বলেন পুলিশের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা।
এ ধরনের সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যেই বর্তমান সরকার বেশিরভাগ মন্ত্রীর পুলিশি প্রটোকল প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানাচ্ছেন বিএনপির নেতারা।
"ঢাকায় এখন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এতটাও খারাপ না যে মন্ত্রীদের সবাইকে বিশেষভাবে সুরক্ষা দিতে হবে। এর চেয়ে বরং পুলিশকে থানায় রাখা গেলে সাধারণ মানুষ বেশি উপকৃত হবে," বলছিলেন বিএনপি'র সিনিয়র এক নেতা।
তিনি জানান, ঢাকার ভেতরে চলাচলের ক্ষেত্রে পুলিশ প্রটোকল কমানোর বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি মন্ত্রিসভায় আলোচনা হয়েছে।

ছবির উৎস, Getty Images
"সেখানে মন্ত্রীরা সবাই প্রটোকল প্রত্যাহার করার বিষয়ে একমত হয়েছেন। তারপরও গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় যেসব মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীদের প্রটোকল রাখা জরুরি বলে মনে হয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে প্রটোকল বহাল রাখা হয়েছে," বলেন ওই বিএনপি নেতা।
প্রধানমন্ত্রীর একজন উপদেষ্টা জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেও তার পুলিশি প্রটোকল কমিয়ে ফেলেছেন।
"প্রধানমন্ত্রীর মূল নিরাপত্তায় মূলত থাকছে বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী (এসএসএফ)। আর পুলিশের সংখ্যা কমিয়ে অর্ধেকে নামিয়ে আনা হয়েছে," বলেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই উপদেষ্টা।
মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশকে গত ২০শে জুলাই থেকে প্রটোকল প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত কার্যকর করার নির্দেশনা দেয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
এর ফলে ১৮ জন মন্ত্রীর বিশেষ নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা প্রায় ৯০ পুলিশ সদস্যকে এখন অন্য জায়গায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষার কাজে ব্যবহার করার সুযোগ হয়েছে বলে জানাচ্ছেন কর্মকর্তারা।
সেইসঙ্গে, প্রটোকলে গাড়ির ব্যবহারও ২৫টি থেকে কমে সাতটিতে নেমেছে।
"এর ফলে একদিকে যেমন জ্বালানি সাশ্রয় হচ্ছে, তেমনি পুলিশের গাড়ি সংকটও কিছুটা কমেছে," বলছিলেন ডিএমপি'র সুরক্ষা বিভাগের উপকমিশনার মো. শাহরিয়ার আলম।
কিন্তু অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর লক্ষ্যে নেওয়া এই সিদ্ধান্ত কতদিন বহাল থাকবে?
"সিদ্ধান্তটা স্থায়ীভাবেই নেওয়া। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামীতেও এটা বহাল থাকবে এবং অন্যান্য ক্ষেত্রেও ধীরে ধীরে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় ও সম্পদের অপচয় রোধ করা হবে," বলেন প্রধানমন্ত্রীর ওই উপদেষ্টা।








